রোয়াংছড়ির দেবতাখুম | পাহাড় ও ঝর্ণার এক লীলাভূমি বান্দরবান
রোয়াংছড়ির দেবতাখুম

রোয়াংছড়ির দেবতাখুম | পাহাড় ও ঝর্ণার এক লীলাভূমি বান্দরবান

ঘুরতে যেতে কে না ভালোবাসে ? আর যদি সেটা হয় নিজের কাছের বন্ধু-বান্ধব অথবা অন্য কারো সাথে?

আসলে শহরের ব্যস্তময় জীবনে ও ধুলোবালি, গাড়ির হর্ন, দূষিত পরিবেশ, রাস্তার যানজট, ঘনবসতি পেরিয়ে আমরা সবাই যখন অতিষ্ট। ঠিক তখনি আমরা শান্তি সহকারে বিশুদ্ধ শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য সবাই ব্যাকুল হয়ে উঠি।

কিন্তু সেই সময় আর কোথায় ?
কারণ সপ্তাহে একদিন ছুটির দিনটায় আমরা ভেবে মরি কোথায় যাওয়া যায় ?
কোন পরিবেশটা সুন্দর ?
কোথায় গেলে প্রকৃতির ছোঁয়া খুঁজে পাবো ?
এগুলো ভাবতে ভাবতেই আমাদের ছুটির দিনখানা পেরিয়ে যায়। তবে ঘুরতে যাওয়া আর হয় না। কি তাই না?


আসলে নিত্য নতুন অনলাইনে আর ফেসবুকময় দুনিয়াতে কোনো কিছুই এখন আর অসম্ভব নয়। কারণ এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এসব তথ্য ভান্ডার। এতে করে সময় ও বাঁচে, ভ্রমন হয়ে ওঠে আনন্দদায়ক।

ঠিক এরকম একটি আনন্দপূর্ণ ও ঘনবসতিহীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হচ্ছে বান্দরবানের রোয়াংছড়ির দেবতাখুম

শুনলেই কেমন অদ্ভুত লাগে নামটি তাই না ? হ্যা, তবে অদ্ভুতময় এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে বহু অজানা তথ্য জানার কৌতূহলও। চলুন এবার ঘুরে এসে জেনে আসা যাক এরূপ বহু অজানা তথ্যসমূহ।

রোয়াংছড়ি দেবতাখুম সম্পর্কে অজানা তথ্যসমূহ

নির্জন ও কোলাহলহীন নীরব প্রকৃতির এলাকা হিসেবেই সকলের কাছে সুপরিচিত বান্দরবানের রোয়াংছড়ির দেবতাখুম এলাকাটি। দেবতাখুম নাম হলেও এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো দেবতা বা মূর্তি পাওয়া যায় না।

নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ বাহিরে, নির্জন ও শব্দ বিহীন দেবতাখুম। কি এক ভুতুড়ে পরিবেশ ! বিন্দুমাত্র কোনো শব্দ নেই এখানে। শব্দ না থাকার ফলে যখন কেউ তার শাস- প্রশ্বাস নিবে তার শব্দও কানে বিঁধে যায়। আশেপাশের বিশাল পাহাড়ের আনাচে কানাচে সরু ও সংকীর্ণ তৈরী আঁকাবাঁকা সুন্দর পথ। যে পথের সাহায্যে মানুষ তার নিজ চোখে দেবতাখুমের সৌন্দর্য দেখে উপভোগ করতে পারে। এই পথ পাড়ি দিতে হয় ভেলায় করে। মূলত দেবতাখুমের প্রধান বৈশিষ্টই হচ্ছে তার বুক চিড়ে ভেলার চলাচল। যা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণবিন্দু।

দেবতাখুমে গেলে মহান আল্লাহ তায়ালার অপরূপ সৃষ্টি বিশাল প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন আপনি। মিশে যাবেন তার প্রকৃতির সাথে।

বান্দরবানের আদিবাসীদের মতে, এই দেবতাখুম প্রায় ৫০ ফুট গভীর ও ৬০০ ফুট লম্বা। দেবতাখুমের পাশেই শীলবাধা বয়ে চলা ঝর্ণা। অদ্ভুত যার সৌন্দর্য। চাইলেই সেখানে যেয়ে গা ভিজিয়ে শিক্ত হয়ে আসতে পারেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে পাবেন মেঘমালা। কি দারুন দেখতে!!!

খুমের স্বর্গরাজ্য হচ্ছে বান্দরবান। আর এই খুমেই লুকিয়ে আছে বিশালাকার ঘন ঘন জঙ্গল এবং এর খাড়া পাহাড়ের কারণে দিনের বেলায় ও ভিতরে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছে না। ভেলা ভাসিয়ে যতই আপনি এর গভীরে যাবেন ততই পরিবেশ ঠান্ডা শীতল ও নিস্তব্দতা হতে থাকবে। নিস্তব্দতা এতটাই থাকবে যে আপনি দূর থেকে পাতার গা ভেদ করে পানি পড়ার শব্দও স্পষ্ট শুনতে পারবেন।

এখানকার আদিবাসী স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। এই কুমে বিরাট বড়একটা কচ্ছপ অথবা অন্য কোনো নাম না জানা একটি প্রাণী রয়েছিল। যার ওজন ছিল অন্তত ২ মনেরও বেশি। নাম না জানা বিশাল আকৃতির এই প্রাণীটিকে অনেকেই নিজ চোখে দেখেছে বলে তাদের মন্তব্য।

সর্বোপরি এই লোম হর্ষক এই ভুতুড়ে গল্প এবং এই খুমের ভিতরতার নির্জন পরিবেশ আপনাকে দিবে এক রোমাঞ্চকর অনুভুতি। কিন্তু অবশ্যই আপনাকে এখানকার সম্পূর্ণ আমেজ পেতে হলে গাইড নিয়ে ঘুরতে হবে এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।


রোয়াংছড়ি দেবতাখুম ঘুরতে সতর্কতা

রোয়াংছড়িতে ঢুকতে আপনাকে অবশ্যই আর্মি ক্যাম্প থেকে তাদের অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হবে। শিলবান্ধা থেকে মিনিট ১৫ হাঁটলেই প্রথমে পং সু আং কুম পাড় হয়ে দেবতাখুমের শুরু। দেবতাখুমে যাওয়ার শেষের দিকের রাস্তা খুবই ভয়াবহ ও বিপদজনক। শ্যাওলা ভরা খাড়া পাথর দিয়ে গাছের শেকড় ধরে প্রায় ঝুলে ঝুলে যেতে হয়। আর বাকি সব রাস্তায় ভালো ও উপভোগ যোগ্য ।

রোয়াংছড়ি দেবতাখুমে যা যা দেখতে পাবেন ?

শীলবান্ধার আশেপাশে ঘুরলে ছোট বড় প্রায় ৫ থেকে ৬ টি ঝর্ণার দেখা মেলে। ঝর্ণার পানিগুলো বেশ স্বচ্ছ। দেখলেই গা ভিজিয়ে ক্লান্ত মনকে শীতল করে নিতে ইচ্ছে করবে। ঝর্ণার পাশেই ঝিরি ও পাইন্দু খাল। খালগুলোর স্রোতও অনেক বেশি। মাঝে মধ্যে বড় পাথর গুলোতে পানি সশব্দে আছড়ে পড়ছে। পাথরের উপরে অবির্ভুত পতিত পানির শব্দ এক মনোমুগ্ধকর আওয়াজ সৃষ্টি করে।

ঝর্ণার একদিকে একটা মোটা বিশাল গাছ পড়ে যা এক পাথর থেকে আরেক পাথরে মিশেছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে ঝর্ণার উপরের অংশ সামনের দিকে কিছুটা ঝুকে আছে। ঝর্ণার পাড়ে গেলে মনে হবে পানির দেয়ালে বন্দি আপনি। ঝর্ণার আশেপাশে অনেক বড় বড় পাহাড় আছে।

সত্যি মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির কোনো তুলনা হয় না। আমাদের জন্য তিনি কত সুন্দর করে বিশাল এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন কি এক অপরূপ রূপে।

দেবতাখুমের দু দিকে দালানের মতো প্রায় ১০০ মিটার খাড়া পাহাড়। যার নাম সিপ্পি পাহাড়। ঘন বন জঙ্গল আর খাড়া পাহাড়ের ফলে দিনের বেলায় ভিতরে আলো না পৌঁছানোর ফলে ভিতরটা অন্ধকারে ঘেরা থাকে। পরিবেশটা হয়ে ওঠে নির্জন ও ভুতুড়ে ভুতুড়ে ভাব।

সিপ্পি আয়সুয়াং নামের ২৯৩৯ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই পাহাড়টি বান্দরবানের পূর্ব প্রান্তে ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে মোটামোটি দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত।

পাহাড়ের স্বাদ ও গন্ধে নিজে মিশে যেতে চাইলে পায়ে হেঁটে যাওয়াই শ্রেয়।

এছাড়াও রোয়াংছড়ির বাজারে পাশ ঘেঁষে নামলেই এক পাহাড়ি ছড়ায়। বর্ষায় এ ছড়া বৃষ্টির পানিতে টইটুম্বুর থাকে। আর চড়ার বুকে ছড়িয়ে আছে অগণিত ছোট-বড় পাথর। দুই পাশে শুধুই ঝোপঝাড়ে আবৃত। কখনো কখনো এই ঝোপঝাড় খাড়া হয়ে উঠেছে। ছড়া পাড় হলেই পাহাড়ে ওঠা যায়। উঁচু-নিচু এই পাহাড়ি পথের দুই পাশে কখনো ঘাসের বন, আবার কখনো সেগুন গাছের বাগান দৃষ্টিগোচর হয়।

এই অঞ্চলে পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট জুমঘর চোখে পরে। চারপাশটা এক অপূর্ব দৃশ্যে পরিপূর্ণ। রাস্তা গুলো খাড়া হয়ে নিচের দিকে ঢালু হয়ে পড়েছে। আর রাস্তার ডান পাশে অদূরে উকিঁ দিচ্ছে বাংলাদেশের বৃহৎ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এর চূড়া।

হাটঁতে হাটঁতে চলে যাওয়া যায় রনিনপাড়ার মুখে। রনিনপাড়ায় যেতে হলে রাস্তা দিয়ে খাড়া পাহাড় বেয়ে যেতে হবে। বলার বাহুল্য যে রণিনপাড়াটি বেশ দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত হলেও বেশ সুন্দর এই অঞ্চল। এখানকার পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো আপনার উপভোগের সীমা বাড়িয়ে তুলবে।

রোয়াংছড়ি দেবতাখুমে আদিবাসীদের অবস্থান

এখানকার আদিবাসীদের থাকার জন্য সব বাড়িগুলোই মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচু খুটির উপরে অবস্থিত। এতে করে বন্য পশুপাখির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকটি ঘরে সোলার প্যানেলের কল্যানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি ঘরের মেঝে ও চারপাশটা শুকনো কাঠ দিয়ে তৈরী। মাটি থেকে উঁচু এই ঘর গুলো থেকে নামার জন্য আছে শুকনো কাঠের তৈরী লম্বা উঁচু সিঁড়ি। কাঠের সিঁড়ি বেয়েই আদিবাসীরা ওঠা নাম করে।

আর এই সোলারের সুবাদে পুরো পাহাড় জুরে টিমটিমে আলোর ফলে রাতের বেলায় স্বচ্ছ ভাবেই সব কিছু ভালো ভাবে স্পষ্ট দেখা যায় দূর থেকে।

অঞ্চলটিতে পানির কোনো সমস্যা নেই বললেই চলে। সিপ্পির গা বেয়ে নেমে আসা ঝিরিঝিরি স্বচ্ছ পানিগুলো থেকে লোহার পাইপে করে পানি এনে সরবরাহ করা হয় গোটা গ্রাম জুড়ে। আর বৃষ্টি দিনে আধিবাসীরা বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করে রাখে তাদের চৌবাচ্চায়।

এখানকার ছোট বড় এই শুভ্র পাহাড়গুলো দেখলে মনে হবে আমারা যেন এই পাহাড়েরই সন্তান।পাহাড়েই কাটছে আমাদের শৈশব, কৈশর আর যৌবন।

পাহাড়ের চূড়ায় বসে ক্লান্ত ও ক্ষান্ত এ মন বিশ্রামের জন্য মন মেতে উঠে। আর সকালে রোদের আলোতে পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য বেড়ে যায় হাজার গুন্। কি অপূর্ব দেখতে লাগে! দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ একজন শুভ্র পাহাড়গুলোতে সোনালী আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।

ক্লান্ত মনকে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া দিতে চাইলে আজকেই চলুন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নিবিড় ঘন পরিবেশটিতে। যেখানে আপনি হয়ে উঠবেন সেই পরিবেশের রাজা। 
রোয়াংছড়ি দেবতাখুমে ঘুরতে হলে সাথে যা যা নিতে হবে

তবে সাথে গাইড নিতে অবশ্যই ভুলবেন না যেন। পুরো দেবতাখুম ঘুরে আসতে সময় লাগবে প্রায় ২ থেকে আড়াই ঘন্টা। দেবতাখুমের পরেই স্বর্ণ খুমের শুরু। বলে রাখা ভালো যে স্বর্ণমুখে যেতে হলে অবশ্যই সাথে করে তাবু নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। খাবার তৈরির জন্য রান্নার সব সরঞ্জামাদি সাথে নিয়ে যেতে হবে। এই ভ্রমণে পাথর, পাহাড়, কুম, ঝর্ণা, বনফুলের সৌরভ আপনার ভ্রমণকে করবে অসাধারণ। দেবে এক অনন্য অনুভূতির সম্প্রসারণ।

কিভাবে যাবেন ভাবছেন রোয়াংছড়ি দেবতাখুমে ?

খুব সহজ উপায়ে আপনি ও যেতে পারেন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আনন্দময় পরিবেশটিতে।
ঢাকা থেকে বান্দরবানের যে কোনো বাসে আপনি প্রথম বান্দরবান যাবেন। এসি ও নন এসি দুই ধরণের বাস পাবেন সেখানে।

বান্দরবানে পৌঁছালে বান্দরবান থেকে রোয়াংছড়ি যাওয়ার জন্য বাস অথবা জীপ গাড়ি আছে। ভাড়া জন প্রতি নিবে মাত্র ৬০ টাকা। রোয়াংছড়ি থেকে কচ্ছপতলী। কচ্ছপতলী থেকে শীলবান্ধা পাড়ায় যেয়ে আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিয়ে ভেলার সাহায্যে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে চলে যেতে পারেন এতো সুন্দর এই পরিবেশটিতে।

নিজে আনন্দিত থাকুন এবং অন্যদের মাঝেও সে আনন্দটুকু ছড়িয়ে দিন। পরিবেশকে আপন করে নিন। দেখবেন পরিবেশ ও পৃথিবী আপনাকে কতটা আপন করে নিয়েছে।
এবং সময় ও সুযোগ বুঝে ঘুরে আসুন ও প্রকৃতির সাথে নিরিবিলি কথা বলে আসুন রোয়াংছড়ির দেবতাখুম থেকে। মনের সব দুঃখ-কষ্ট গুলো ফেলে আসুন সেখানে। বেঁচে থাকুন আনন্দের সাথে।

আমাদের পোস্টটি যদি কিছুটা হলেও ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করবেন এবং অন্যদের জানার সুযোগ করে দিন। দেখবেন আপনার মাধ্যমে পৃথিবীর কতগুলো মানুষ ফিরে পাবে তাদের হাসি-আনন্দটুকু।

এবং অবশ্যই আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে ফেইসবুক গ্রুপ শেয়ার করবেন। আপনি আমাদের সাথে ফেইসবুক এ কানেক্ট থাকতে পারেন ।


বি.দ্র: আপনার পছন্দের জায়গাগুলো যেখানে আপনি এখনও ভ্রমন করেন নি তবে সেখানে যেতে চান! এরকম নিজের সব পছন্দের স্থানগুলোর নাম লিখে ও কিভাবে যেতে হবে তার সকল তথ্যসমূহ জানতে হলে আমাদের ফেসবুক গ্রুপে হেল্প পোস্ট করুন। আমরা আপনার পছন্দের স্থানগুলোর সকল তথ্য দিতে সচেষ্ট থাকবো সর্বক্ষণ।

Leave a Reply